ঢাকাবৃহস্পতিবার, ১১ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রাত ২:০১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্মার্টফোনেই আত্মনির্ভরতার দিশা দেখাচ্ছে “SWAJAN(স্বজন)-Caring Seniors” ফেসবুক গ্রুপ।

মাহমুদুল হাসান, সাব-এডিটর
জুন ১২, ২০২০ ৯:০০ অপরাহ্ণ
পঠিত: 43 বার
Link Copied!

মহিউদ্দীন আহমেদ, বোলপুর, পশ্চিমবঙ্গ,ভারত।

 

কারোর বয়স সত্তর, কারোর আশি পেরিয়েছে। ছেলেরা চাকরী সূত্রে বাড়ী থেকে বহুদূরে বা বিদেশে। মেয়েরা বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়িতে। বেশিরভাগই হতাশার শিকার, কেউ একা কেউ বা আবার জোড়ে‌। অতীতের সুখের স্মৃতিচারন করেই টিকে থাকা। ছেলে-মেয়েরাই যখন নিজেদের সংসার সামলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে পারে না তখন কতটাই বা ভরসা করা যায় পাড়া প্রতিবেশীর উপর?

 

এই হতাশা ব্যাঞ্জক পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে আশার আলো দেখাচ্ছেন এক ছিয়াত্তরের তরুণ। নাম হারাধন মন্ডল। পেশায় স্থপতি। বোলপুর তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। পৌরসভার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শদাতা। বোলপুর-শান্তি নিকেতন প্রবীনকল্যান সমিতির উৎসাহী সদস্য। হ্যাঁ ওনারা নিজেদের তরুণই ভাবেন। ষাট বছরে পূনর্জন্ম থেকে বয়সের হিসাব ধরলে তেমনটাই হয়।

 

তিনি বলছেন ছেলে মেয়েদের ব্যাস্ত জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে স্বনির্ভরতার আদর্শকে পাথেয় করে প্রবীন‍রা সঙ্ঘবদ্ধভাবে একে অন্যের পাশে দাঁড়াবেন। অসুস্থ প্রবীনকে জরুরীভিত্তিক ভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন এবং ছেলেমেয়েরা না আসা পর্যন্ত সঙ্গে থাকবেন। চলচ্ছক্তিহীন প্রবীনদিকে সঙ্গদান করবেন নিয়মিত —তা সে বাড়ি গিয়েই হোক বা টেলিফোনেই হোক।

তাঁর মতে এই সবার সঙ্গে সবার নিরন্তর জুড়ে থাকার হাতিয়ার স্মার্টফোন এই শতাব্দীর এক আশ্চর্য্য আবিষ্কার। তাছাড়া ইলেকট্রিক সহ তাবৎ বিল জমা দেওয়া, মোবাইল রিচার্জ করা, ব্যাংকের টাকা হস্তান্তর করা, ওষুধ থেকে শুরু করে সমস্ত জিনিষের কেনাকাটা, বাড়ি বসে ট্রেনের টিকিট কাটা, ট্যাক্সি ডাকা সবই হচ্ছে স্মার্টফোনের সাহায্যে, অন লাইনে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসব কাজ করার ধকল না থাকলে প্রবীনদের জীবন হবে অনেক ঝামেলা মুক্ত।

 

তাছাড়া এত কিছু সুবিধার ফাউ এর মত স্মার্টফোনের সাহয্যে ভিডিও কল এবং কনফারেন্সিং করে ছেলেমেয়ে নাতি নাতনী দের কথা বলতে দেখতে পাওয়া একাকীত্বকে কমিয়ে আনবে। তাই স্মার্টফোনকে কার্যকরী ভাবে ব্যবহার করা শেখাচ্ছেন অনভিজ্ঞ প্রবীনদের।

 

এইসব কাজের সুবিধার কথা মাথায় রেখে খুলেছেন ফেসবুক গ্রুপ ” SWAJAN(স্বজন) -Caring Seniors”। তাতে ৫৫ বছরের বেশি বয়সী স্মার্টফোন ব্যবহারে স্বাক্ষররা যোগ দিতে পারেন। অনেক প্রবীন ফেসবুকে স্বচ্ছন্দ নন বলে সাথে আছে যোগাযোগ এবং বিনোদনের জন্য whatsapp গ্রুপ। অন্য রাজ্য বা বিদেশের কথা বাদ দিয়ে আমাদের রাজ্যে আছে গ্রুপের 400 র বেশী সদস্য। এই সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান সদস্যদের কথা ভেবে তিনি স্বজনের আঞ্চলিক এবং স্থানীয় দল তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। তাঁর কথায় বাস্তবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে কাছে থাকা স্থানীয় দল গুলিই। আঞ্চলিক বা কেন্দ্রীয় কমিটিগুলি দূর থেকে মূলতঃ তত্বাবধায়কের কাজ করবে।

 

হারাধন বাবুর কথায় আজকের দিনে যোগাযোগ ভিত্তিক কাজ স্মার্টফোন ছাড়া হওয়াই সম্ভব নয়।

ল্যান্ড ফোনের সময় ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ করতে হোত। কে ফোন করছে তাও জানা যেত না। বয়স্কমানুষের পক্ষে সেই ফোন তাৎক্ষনিক ভাবে ধরার অসুবিধা ছিল। এখন স্মার্ট ফোন বা মোবাইলে কে ফোন করছে সেটা বোঝা যায়। সময়মত রিসিভ করতে না পারলে পরে কল-ব্যাক করতে পারার সুযোগ আছে। হোয়াটস এ্যাপে লিখে বা মেসেঞ্জারে ভয়েস ম্যাসেজ করে যোগাযোগগুলি রেকর্ড করিয়ে দিলে প্রাপক সুবিধা মতো সময়ে দেখলেন বা শুনলেন এবং উত্তর পাঠালেন। তাই তিনি বয়সের ভারে পিছিয়ে পড়া প্রবীনদের সহমর্মিতার সঙ্গে স্মার্টফোনের ব্যবহার শেখাতে তৎপর হয়েছেন।

 

কথায় কথায় তিনি জানালেন বোলপুর শান্তিনিকেতন প্রবীনকল্যান সমিতির ছত্রছায়ায় তিনি একটি প্রবীনকল্যান কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাঁর কথায় সত্তরোর্দ্ধ বয়স্ক দম্পতি নিত্যনৈমিত্তিক সাংসারিক কাজ চালিয়ে নিলেও একজন অসুস্থ হয়ে পড়লেই মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে। এই বয়সে একজনের পক্ষে আর একজনকে সেবা দেওয়া বড়ই কঠিন। যদি আরোগ্য হোম এর মত ব্যাবস্থা হয় যেখানে nursing home এর ঢংয়ে পেশাদার আয়া বা নার্সের তত্বাবধানে থেকে সুস্থ হয়ে ফেরা যায় তাহলে ফলশ্রুতি হিসাবে নিজের বাড়িতে নিজের পরিবেশে থাকা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

এ ধরনের ফেসিলিটি সেন্টারে আরোগ্য হোম ছাড়াও জেরিয়াট্রিক হেল্থ এবং মেডিকেয়ার সেন্টার, জেরিয়াট্রিক লাইব্রেরি এবং কাউন্সেলিং সেন্টার ইত্যাদি ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। চেষ্টা করা হচ্ছে শহরের অনাবাসী কোন বনেদী পরিবারের অব্যবহৃত বাড়ি সহ জমি খোঁজার। প্রয়োজন হলে ফেসিলিটি সেন্টারটি জমিদাতা পরিবারের নামে নামাঙ্কিত করা হবে।

 

এই সব আশাব্যঞ্জক কথার ফাঁকে ফাঁকে কিছু অসুবিধার কথাও তিনি জানালেন। তার মধ্যে যেটি প্রধান তা হলো বাবা মায়েদের বাইরের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে ছেলেমেয়েদের প্রচ্ছন্ন আপত্তি। মূল ভয় পারিবারিক গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার।

সেটা কাটানোর জন্য তিনি চেষ্টা করছেন পাড়ার 2/3 জন পরিচিত প্রবীন সদস্য নিয়ে পাড়াদল তৈরি করার। এঁরা সদস্যদের বাড়িতে পালাক্রমে চা খেতে গিয়ে গিয়ে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়লে বাধা কমে আসবে। অনাবাসী ছেলে মেয়েদের তরফ থেকে অবশ্য এরকম বাধা আসেনা।

 

যাই হোক আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে আমার মূখের শেষ প্রশ্নটি কেড়ে নিয়ে জানালেন তাঁর এখনকার কাজকর্মকে তিনি ভবিষ্যতের “স্বনির্ভর প্রবীন” আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্থর হিসাবে দেখছেন। তাই সময় এবং তদারকি দিচ্ছেন অকৃপনভাবে এবং স্বেচ্ছায়।নিজের জীবদ্দশায় এর সফলতা যদি দেখতে নাও পান একদিন এ আন্দোলনের বিপ্লবের রূপ নেওয়া সম্বন্ধে তিনি যথেষ্ঠ আশাবাদী।

দৈনিক বাংলাদেশ আলো পত্রিকায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না