আমার শৈশবে ঈদ — রতন চৌধুরী।


মাহমুদুল হাসান, সাব-এডিটর প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৫, ২০২০, ১০:১৮ পূর্বাহ্ন /
আমার শৈশবে ঈদ — রতন চৌধুরী।

আমার শৈশবে ঈদ
— রতন চৌধুরী।

তখন বয়স সম্ভবত ৪-৫ বছর। বাবার চাকরির কারণে সরদহ, চারঘাট, রাজশাহীতে কেটেছে শৈশব। বাবা শিক্ষক ছিলেন। উনি সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। পুলিশ ট্রেনিং কলেজ সংলগ্ন এ বিদ্যালয়। আমার বাবা শ্রদ্ধেয় শ্যামা প্রসাদ চৌধুরী একজন ব্যাকরণে পন্ডিত ব্যাক্তি ছিলেন। এজন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পড়শী, দোকানী সকলের কাছে তিনি ছিলেন পন্ডিত স্যার। ছোটবেলায় ভাবতাম বাবার নামই বোধ হয় পন্ডিত স্যার। স্কুলের দো’তলার কোয়াটারে আমরা থাকতাম। একই সাথে অন্য আরো তিনটি শিক্ষক পরিবার থাকতেন। মোট চারটি পরিবার স্কুলের বাম পাশের কোয়াটারে থাকতেন।

স্কুলে প্রতি বছর সরস্বতী পূজা হতো বাবার নেতৃত্বে। সে এক ধুম ধুম ভাব। সারা বছর অপেক্ষা করতাম কখন আবার সরস্বতী পূজা হবে। পূজার প্রসাদ ছিল বেশ বাহারি। লুচি, বুদিয়া, পায়েশ, বাঁধাকপি’র তরকারি, পাঁচ মিশালী সবজি, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি ও ফল, দই, বিভিন্ন প্রকার নাড়ু ইত্যাদি ইত্যাদি। পাশাপাশি যখন ঈদ আসতো তখন বাসায় বাহারি রান্না করা হতো। সকাল থেকেই মা ব্যস্ত থাকতেন রান্না কাজে। সকালে সেমাই, চালের রুটি, দুপুরে খাসীর মাংস, পোলাও, পায়েশ, মিষ্টি, দই, চাটনি ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন ভাবনায় থাকতো পূজা বা ঈদ দু’সময়েই বাহারী খাবারটাই আসল। তখনও স্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ি না। তবে কোথায় কাদের ক্লাস হয় তা আয়নার মতো পরিস্কার ছিল। বাবা কখন কোন রুমে ক্লাস করাতেন তাও জানা ছিল। পূজা বা ঈদ নিয়ে বাসায় বা সহপাঠীদের সাথে পূর্বাহ্নেই আলাপন চলতো। তাই মনে মনে পরিকল্পনাও ঠিক থাকতো তখন কি কি করবো বা হবে। ঈদে বাজারে তখন সেমাই, কিশমিশ, বিভিন্ন মসলা দোকানগুলোতে কিনতে পাওয়া যেতো। তাই প্রতিদিনই কিশমিশ কেনার লোভ সামলাতে পারতাম না। অপেক্ষা করতাম কখন বাবার ছুটি হবে, তখনই বাজারে গিয়ে কিশমিশ কিনে এনে খাবো। বাজারে ছিল চন্দ্র পালের মুদি দোকান। বাবার সাথে তার বেশ ভাব ছিল। সেখানে কিশমিশ কিনতে পাওয়া যেতো। প্রতিদিনই উদ্দেশ্য থাকতো বাবার সাথে চন্দ্র পালের মুদি দোকানে যাওয়া ও কিশমিশ খাওয়া। সে এক নেশায় পেয়ে বসলো। কেন যেনো ঈদ শেষে ওই দোকানো আর কখনোই কিশমিশ দেখিনাই। অথবা থাকতো কিন্তু চোখে পরতো না। খুব কষ্ট পেতাম।

একবার সন্ধ্যায় আমরা দুই ভাই ও বাবা ঈদে দাওয়াত খেতে গেলাম পুলিশ ট্রেনিং কলেজের ডিআইজি’র বাসায়। প্রসঙ্গ ক্রমে বলে রাখি ডিআইজি মহোদয় সরস্বতী পূজায় বাবার বা স্কুলের আমন্ত্রণে অতিথি থাকতেন। এছাড়াও বাবার কাছে প্রাইভেট পড়তো তাঁর সন্তানেরা। যা হোক, খেতে বসেছি আমরা দুই ভাই ও বাবা। অনেক পদের খাবার মাঝে একটি আইটেম ছিল জর্দা। আমিতো মজা করে বেশ কিছু জর্দা খেলাম। এতো সুন্দর স্বাদ কিন্তু বাবা কেন আমাকে এটা খেতে বারণ করেছেন ইতিপূর্বে সে কথা ভাবলাম। মনে মনে রাগ করলাম বাবার উপরে। দাওয়াত খাওয়া শেষে বাসায় এসে চুপচাপ আছি আর ভাবছি কালকে অবশ্যই জর্দা খাবো। তবে বাবাকে না বলে। যা কথা সেই কাজ। পরদিন সকালেই বাবার পানের ডিব্বার কাছেই পেয়ে গেলাম জর্দা। পুরে দিলাম কিছুটা মুখে। অমনি ধরাও পরে গেলাম বাবার কাছে। বাবা আমার মুখ থেকে জর্দা ফেলে দিতে বলে মুখ কুলি করে দিয়েছিলেন। আর বার বার মুখ ও জিহবা দেখছিলেন ভয়ে। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন বিষয়টা, কেন আমি এমন করেছি। মা’কে বলেছিলেন বিষয়টা। কিন্তু মা সেই ঈদের সময়ে তৈরি করা জর্দা বানাতে পারতেন না। উনি শুনেছেন কিন্তু বানানোর প্রক্রিয়া জানতেন না তখন। তাই বাসায় মায়ের হাতে জর্দার পরিবর্তে পায়েশ খেতে হয়েছিল। পায়েশ খাওয়া শেষে হঠাৎই দরজায় শব্দ। বাবা দরজা খুললেন, জনৈক ছাত্র চারঘাটের ঈদের মেলা থেকে আমাদের দুই ভাই এর জন্য দুইটা মাটির ব্যাংক এনেছিলেন, যার একটির নাম ‘রূপালী ব্যাংক’ ও অপরটি ‘জনতা ব্যাংক’। আমি অবশ্য রূপালী ব্যাংক নিয়েছিলাম কারন আমার দাদা আগেই জনতা ব্যাংক নিয়েছিল। আর মুহূর্তেই আমি রূপালী ব্যাংকের মালিক হয়ে গেলাম। বাবার সেই ছাত্র শুধু ব্যাংক এনেছিলেন তা নয়, সাথে এনেছিলেন বাঁশি ও দুই চাকার ব্যাঙ গাড়ী। কি যে আনন্দ পেয়েছিলাম তখন তা ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও জর্দার পরিবর্তে পায়েশ খাওয়ার দুঃখ ভুলে গিয়েছিলাম এটা এখন মনে পরছে।