সোনালি আঁশ পাট নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন চাষিরা


বিডি আলো ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুলাই ৯, ২০২১, ১১:১৭ অপরাহ্ন /
সোনালি আঁশ পাট নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন চাষিরা

বিশেষ প্রতিনিধি রবিনঃ

এক সময় পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। কিন্তু  এ সোনালি আঁশ কৃষকের গলার ‘ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল,কিছুটা সময়ের আবর্তনে। তখন অনেক কৃষকই পাট চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।তবে আবারও পাটের সুদিন ফিরে আসছে। পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যে ব্যবহার বাড়াতে ভোক্তাদের আগ্রহী করা হচ্ছে। অপরদিকে পাট চাষে আগ্রহী করতে চাষিদেরকে সরকার থেকে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। গত বছর থেকে আবারও পাটের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন চাষিরা। মাঝখানে পাটের আবাদ কমলেও আবারও পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে চাষিদের। পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে পাটের আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে।নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও পাট উন্নয়ন অফিস কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমি। সেখানে ৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে।যেখানে প্রায় ৭৭ হাজার ৩৬৫ বেল পাট উৎপাদিত হবে বলে আশাবাদী। কম পরিমাণ জমিতে চাষ হলেও গত বছর বাজারে ভালো দাম পেয়েছিল চাষিরা। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলার পাটের আবাদ হয়েছিল ৬ হাজর ১৫০ হেক্টর, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬ হাজার ৯৩০ হেক্টর এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছিল।
এ বছর দেশি, তোষা এবং মেস্তা জাতের পাট চাষ করেছেন কৃষকরা। দেশি জাতের মধ্যে সিভিএল-১ ও ডি-১৫৪, তোষা জাতের মধ্যে ও-৪, ৭২, চাকা ও বঙ্গবীর এবং মেস্তা জাতের পাট উল্লেখযোগ্য। যেখানে দেশি জাতের ৫০০ হেক্টর, তোষা জাতের ৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর এবং মেস্তা জাতের ৪০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৯১০ হেক্টর, রানীনগরে ৩৫ হেক্টর, আত্রাইয়ে ২৩৫ হেক্টর, বদলগাছীতে ১ হাজার ৮১৫ হেক্টর, মহাদেবপুরে ১১৫ হেক্টর, পত্নীতলায় ২৩ হেক্টর, ধামইরহাটে ১ হাজার ৫২০ হেক্টর, মান্দায় ১ হাজার ৯৯০ হেক্টর। গত বছর প্রকার ভেদে প্রতিমন পাট ২ হাজার ৫শত ৩ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে।এদিকে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাট বীজ উৎপাদন এবং পাট সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় জেলার চারটি উপজেলায় ১০ হাজার ১৮০জন পাট চাষিকে (প্রতিজনে ১২ কেজি সার-তিন কেজি টিএসপি, তিন কেজি পটাশ, ছয় কেজি ইউরিয়া এবং প্রতি বিঘায় এক কেজি বীজ) বীজ ও সার এবং ৪০০ জন পাট চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।সূত্র জানায়, পাট বিষয়ে গবেষণা, পাটের উৎপাদন, বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন, ব্যবহার ও রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে পাট সংশ্লিষ্ট খাতগুলো। এছাড়া পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধিতে কাজ করছে সরকার।এরই অংশ হিসেবে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০ ও এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করেছে মন্ত্রণালয়। এর ফলে ধান, চাল, গম, সার ও চিনিসহ ১৯টি পণ্য মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়ায় দেশের বাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।জেলার আত্রাই উপজেলা দমদমা গ্রামের পাট চাষি আরমান আলী বলেন, এ বছর তিন বিঘা জমিতে উন্নত জাতের পাট লাগিয়েছেন। গত বছরও একই পরিমাণ পরিমাণ জমিতে পাট লাগিয়েছিলেন। গত বছর ২ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছিলেন। যা বিগত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ দাম বেশি পেয়েছেন।এক বিঘা জমিতে লাগানো থেকে শুরু করে সার, ঔষধ, শ্রমিক, পানি, কাটা, জাগ দেয়া ও শুকানো পর্যন্ত প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। আর সব্বোর্চ ভালো ফলন হলে ১৪ মণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে দাম ভালে পাওয়া গেলে মনে কষ্ট থাকে না।
একই উপজেলা শুকটিগাছা গ্রামের কৃষক সোলাইমান হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগেও পাটের দাম ভালো না পাওয়ায় অনেক চাষি পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। পাট লাগানো থেকে শুরু করে ঘরে উঠানো পর্যন্ত প্রচুর কষ্ট করতে হয়। কিন্তু সে তুলনায় দাম যেত না। গতবছর ভালো দাম পেয়েছি। ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা মণ পর্যন্ত বিক্রি করেছিলাম। দাম ভালো পাওয়ার কারণে এবং লাভবান হওয়ায় এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি।বদলগাছী উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক জব্বার প্রামাণিক বলেন, তিনি এক বিঘা জমিতে এক টানা ৫ বছর পাটের চাষ করেছিলেন। এর আগে দাম না পাওয়ায় মাঝের এক বছর আর লাগাননি। তবে গত বছর পাটের দাম ভালো পাওয়ায় আবারও পাট চাষে আগ্রহী হয়েছেন বলে জানান তিনি।রাণীনগর উপজেলার খট্টেশর গ্রামের কৃষক মাহফুজ বলেন,পাটের সুদিন ছিল না। এখন পাটের দাম ভালো হওয়ায় পাটের সুদিন ফিরছে।আমি পাট চাষ করে ও দাম ভালো পেয়ে এবারও ১,১/২বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি।ধামইরহাট উপজেলার কৃষক সালাউদ্দীন শেখ বলেন, গত বছর ১ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। এবার ২বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। গত বছর পাটের দাম ভালো পাওয়ায় সেই আগ্রহ থেকেই পাটের আবাদ করেছেন। পাট চাষে প্রশিক্ষণে স্যারেরা আমাদের বলেছেন, এই পাট দিয়ে ২০০ এর অধিক পণ্য তৈরি হয়। যে পণ্যগুলো বিদেশে যায়।মান্দা উপজেলার কৃষক শামসুল আলম বলেন,গত বছর থেকে পাট চাষ করছি, দাম ভালো পাওয়ায় এবার ও পাট চাষ করেছি।
নওগাঁ পাট অধিদফতরের উন্নয়ন কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান বলেন, পাটের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাট বীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় জেলার চারটি উপজেলায় এ প্রকল্প চালু আছে।তিনি বলেন, দেশে ও বিদেশে আমাদের পাটের চাহিদা বাড়ছে। গত বছরে মতো এ বছরও কৃষকরা পাটের দাম ভালো পাবে বলে আশা করছি। এছাড়াও আগামীতে আরও বেশি জমিতে পাটের চাষ হবে।নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সামশুল ওয়াদুদ বলেন, আমরা পাট চাষিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। কৃষক পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং পাটের ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছে। আমরা পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।